বিক্রিয়ার হার কাকে বলে? সহজ ব্যাখ্যা ও প্রশ্ন উত্তর

আরে হ্যাঁ! ভেবে দেখুন তো, লোহায় মরিচা পড়তে কত দিন বা মাস সময় লাগে? আবার অন্যদিকে দীপাবলির আতশবাজি ফোটাতে কত কম সময় লাগে, তাই না? চোখের পলকেই শেষ! এই যে সময়ের সাথে কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন কত দ্রুত বা ধীর গতিতে ঘটছে, এটাই কিন্তু রসায়নের এক বিশাল কৌতূহলের বিষয়। একেই মূলত বিক্রিয়ার হার কাকে বলে সেই প্রশ্নের উত্তরে ব্যাখ্যা করা হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই কোনো না কোনো বিক্রিয়া ঘটছে, যার গতি বা হার ভিন্ন ভিন্ন।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানব বিক্রিয়ার হার কাকে বলে এবং এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো। শুধু তাই নয়, পাশাপাশি আমরা জানব বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক কাকে বলে এবং এটি কীভাবে কাজ করে। রসায়নের এই জাদুকরী দুনিয়ায় ডুব দিলে আপনি দেখবেন, জটিল সব সমীকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে কত সহজ সব লজিক। চলুন, আর দেরি না করে মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক!
আরও পড়ুন: রাবির ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল এবং দেখার নিয়ম ও বিস্তারিত
বিক্রিয়ার হার কাকে বলে
সহজ কথায় বলতে গেলে, একক সময়ে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা হ্রাসের হার কিংবা উৎপাদের ঘনমাত্রা বৃদ্ধির হারকে বিক্রিয়ার হার বলে। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রিয়াটি কত দ্রুত বা কত ধীর গতিতে সম্পন্ন হচ্ছে, তার পরিমাপই হলো বিক্রিয়ার হার।
রসায়নের ভাষায়, যদি কোনো বিক্রিয়ায় সময়ের সাথে সাথে বিক্রিয়ক পদার্থগুলো উৎপাদে পরিণত হতে থাকে, তবে যে হারে বিক্রিয়কের পরিমাণ কমে বা উৎপাদের পরিমাণ বাড়ে, তাকেই ওই বিক্রিয়ার হার বলা হয়। গাণিতিকভাবে একে প্রকাশ করা হয় এভাবে:
বিক্রিয়ার হার = (বিক্রিয়ক বা উৎপাদের ঘনমাত্রার পরিবর্তন) / (সময়ের পরিবর্তন)
এর একক সাধারণত মোল/লিটার/সেকেন্ড (mol L⁻¹ s⁻¹) হয়। যখন আমরা বিক্রিয়ার গতিবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করি, তখন অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন যে বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক কাকে বলে আর সাধারণ হারের মধ্যে পার্থক্য কী। মনে রাখবেন, হার হলো গতির পরিমাপ, আর ধ্রুবক হলো সেই গতির আনুপাতিক ধ্রুবক যা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় স্থির থাকে।
বিক্রিয়ার হার নির্ণয়ের পদ্ধতি
বিক্রিয়ার হার নির্ণয় করাটা কিন্তু খুব একটা কঠিন কিছু নয়। এটি মূলত নির্ভর করে আমরা কতটা নিঁখুতভাবে সময়ের সাথে ঘনমাত্রার পরিবর্তন মাপতে পারছি তার ওপর। ল্যাবরেটরিতে সাধারণত দুইটি প্রধান উপায়ে এটি করা হয়ে থাকে:
- বিক্রিয়কের সাপেক্ষে: সময়ের সাথে সাথে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা কতটুকু কমছে তা গ্রাফ বা টাইট্রেশনের মাধ্যমে বের করা হয়।
- উৎপাদের সাপেক্ষে: সময়ের সাথে উৎপাদের পরিমাণ বা ঘনমাত্রা কতটুকু বাড়ছে তা পরিমাপ করা হয়।
গাণিতিকভাবে, যদি ‘R’ বিক্রিয়ক এবং ‘P’ উৎপাদ হয়, তবে ‘t’ সময়ে:
বিক্রিয়ার হার = – d[R]/dt = + d[P]/dt
এখানে ঋণাত্মক চিহ্নটি বোঝায় যে সময়ের সাথে বিক্রিয়কের পরিমাণ কমছে। এই সমীকরণগুলো ব্যবহার করেই বিজ্ঞানীরা নিখুঁতভাবে হার নির্ণয় করেন। এটি জানা থাকলে শিল্পকারখানায় বা ওষুধ তৈরিতে কত সময় লাগবে তা আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব হয়।
বিক্রিয়ার হারকে প্রভাবিত করার উপাদানসমূহ
সব বিক্রিয়া কিন্তু এক গতিতে চলে না। কিছু বিক্রিয়া চোখের পলকে ঘটে, আবার কিছু ঘটতে হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। কিন্তু কেন এমন হয়? আসলে, বিক্রিয়ার হার বেশ কিছু উপাদানের ওপর নির্ভর করে। এই উপাদানগুলো পরিবর্তন করে আমরা ইচ্ছেমতো বিক্রিয়ার গতি বাড়াতে বা কমাতে পারি। প্রধান উপাদানগুলো হলো:
- তাপমাত্রা: তাপমাত্রা বাড়লে সাধারণত বিক্রিয়ার হার বাড়ে।
- বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা: ঘনমাত্রা যত বেশি হবে, অণুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ তত বাড়বে এবং বিক্রিয়া দ্রুত হবে।
- পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল: কঠিন পদার্থের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠতল যত বেশি হবে, বিক্রিয়ার সুযোগ তত বাড়বে।
- প্রভাবক বা অনুঘটক: উপযুক্ত প্রভাবক ব্যবহার করে বিক্রিয়ার গতি কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।
- আলো: কিছু আলোক-রাসায়নিক বিক্রিয়া আলোর উপস্থিতিতে দ্রুত ঘটে।
এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে আপনি বুঝতে পারবেন কেন প্রেসার কুকারে রান্না তাড়াতাড়ি হয় বা কেন খাবার ফ্রিজে রাখলে পচে না।
তাপমাত্রা ও বিক্রিয়ার হারের সম্পর্ক
তাপমাত্রা হলো বিক্রিয়ার হারের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। সাধারণ পর্যবেক্ষণ বলে, তাপমাত্রা বাড়লে বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কেন? যখন আমরা কোনো সিস্টেমে তাপ প্রদান করি, তখন অণুগুলোর গতিশক্তি বেড়ে যায়। ফলে তারা একে অপরের সাথে আরও জোরে এবং ঘন ঘন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
আরহেনিয়াসের সমীকরণ অনুযায়ী, প্রতি ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিক্রিয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যেতে পারে। এটা একটা থাম্ব রুল হিসেবে কাজ করে। তবে সব বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এটি সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রায় অনেক সময় অণুগুলো ভেঙে যেতে পারে বা ভিন্ন উৎপাদ তৈরি হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বিক্রিয়া ঘটানো খুবই জরুরি। এই তাপমাত্রার প্রভাব বুঝেই কিন্তু আমরা জানি বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক কাকে বলে এবং এটি তাপমাত্রার সাথে কীভাবে পরিবর্তিত হয়। কারণ হার ধ্রুবক নিজেই তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল।
ঘনমাত্রা ও বিক্রিয়ার হার
বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা বাড়লে বিক্রিয়ার হার কেন বাড়ে, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? এর পেছনে কাজ করে ‘কলিশন থিওরি’ বা সংঘর্ষ তত্ত্ব। একটি নির্দিষ্ট আয়তনের মধ্যে যখন বিক্রিয়কের অণুর সংখ্যা বা ঘনমাত্রা বেশি থাকে, তখন তাদের নিজেদের মধ্যে ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। আর আমরা জানি, কার্যকর সংঘর্ষই বিক্রিয়া ঘটানোর মূল চাবিকাঠি।
অন্যদিকে, ঘনমাত্রা কমে গেলে সংঘর্ষের হার কমে যায় এবং বিক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে। এই সম্পর্কটিই ভরক্রিয়া সূত্র দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। যখন আমরা কোনো বিক্রিয়ার হার সমীকরণ লিখি, তখন সেখানে একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক আসে। অনেক ছাত্রছাত্রী প্রশ্ন করেন বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক কাকে বলে? মূলত, একক ঘনমাত্রায় কোনো বিক্রিয়ার যে হার পরিলক্ষিত হয়, তাকেই বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক বলা হয়। ঘনমাত্রা পরিবর্তনের সাথে হারের পরিবর্তন হলেও, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এই ধ্রুবকের মান অপরিবর্তিত থাকে।
প্রভাবক বা অনুঘটকের ভূমিকা
প্রভাবক হলো সেই জাদুকরী উপাদান যা নিজে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না বা বিক্রিয়া শেষে অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু বিক্রিয়ার গতিকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে। ভাবুন তো, একটা কঠিন পাহাড় ডিঙিয়ে আপনাকে ওপারে যেতে হবে। প্রভাবক হলো সেই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে তৈরি করা একটি টানেল, যা আপনার যাত্রাপথকে সহজ করে দেয়।
রসায়নের ভাষায়, প্রভাবক বিক্রিয়ার সক্রিয়ণ শক্তি (Activation Energy) কমিয়ে দেয়, ফলে কম শক্তিতেই অণুগুলো বিক্রিয়া করতে পারে। শিল্পক্ষেত্রে, যেমন অ্যামোনিয়া তৈরিতে বা সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনে প্রভাবকের ভূমিকা অপরিসীম। প্রভাবক ছাড়া এসব বিক্রিয়া ঘটাতে এত বেশি শক্তি ও সময় লাগত যে তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতো না। কিছু প্রভাবক আবার বিক্রিয়ার গতি কমিয়েও দিতে পারে, যাদের আমরা ‘ঋণাত্মক প্রভাবক’ বলি।
বিক্রিয়ার হারের ব্যবহারিক উদাহরণ
তাত্ত্বিক কথা তো অনেক হলো, এবার চলুন দেখি বাস্তব জীবনে বিক্রিয়ার হার কীভাবে কাজ করে। আমাদের চারপাশেই প্রতিনিয়ত অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। বোঝার সুবিধার্থে নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে দ্রুত এবং ধীর গতির বিক্রিয়ার তুলনা করা হলো:
| বিক্রিয়ার ধরণ | উদাহরণ | হারের বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| অতি দ্রুত বিক্রিয়া | আয়নিক বিক্রিয়া, যেমন সিলভার নাইট্রেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইডের বিক্রিয়া। | মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন হয় (১০⁻¹² সেকেন্ডের কম সময়ে)। |
| মধ্যম গতির বিক্রিয়া | চিনির ইনভারশন বা স্টার্চের হাইড্রোলাইসিস। | পরিমাপযোগ্য সময়ে ঘটে। |
| অতি ধীর বিক্রিয়া | লোহায় মরিচা ধরা, পৃথিবীর ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তন। | ঘণ্টা, দিন বা বছর লাগতে পারে। |
এই উদাহরণগুলো দেখলে বোঝা যায়, কেন আমরা ল্যাবরেটরিতে সাধারণত মধ্যম গতির বিক্রিয়া নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। কারণ এগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক কাকে বলে তা নির্ণয় করা সুবিধাজনক।
দৈনন্দিন জীবনে বিক্রিয়ার হারের গুরুত্ব
আপনি কি জানেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সুস্থতা ও আরাম-আয়েশ অনেকটাই রাসায়নিক বিক্রিয়ার হারের ওপর নির্ভরশীল? যেমন ধরুন, আমাদের শরীরে খাবার হজম হওয়া। এনজাইম নামক জৈব প্রভাবক যদি না থাকত, তবে এক বেলার খাবার হজম হতে হয়তো ৫০ বছর লেগে যেত! ভাবা যায়?
আবার ধরুন, আমরা যে ফ্রিজে খাবার রাখি, তার মূল উদ্দেশ্য হলো কম তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার কমিয়ে দেওয়া। ফলে খাবার দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকে। অন্যদিকে, প্রেসার কুকারে উচ্চ চাপে ও তাপে রান্নার সময় বিক্রিয়ার হার বাড়ানো হয় যাতে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়। এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলোও এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে তা শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট হারে কাজ করতে পারে। তাই বিক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, রসায়ন বিজ্ঞানে গতিবিদ্যা বা কাইনেটিক্স অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, আজকের এই আলোচনা থেকে আপনারা বিক্রিয়ার হার কাকে বলে সে সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন। বিক্রিয়ার গতি বা হার কীভাবে আমাদের শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রান্নাঘর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে, তা নিশ্চয়ই এখন আপনাদের কাছে পরিষ্কার।
আরও পড়ুন: জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট কবে দিবে ২০২৬ ও ফলাফল দেখার নিয়ম
যদি আপনার মনে এখনো প্রশ্ন থাকে যে বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক কাকে বলে কিংবা এটি কীভাবে গাণিতিকভাবে নির্ণয় করা যায়, তবে পাঠ্যবইয়ের গাণিতিক সমস্যাগুলো চর্চা করতে পারেন। বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন শেখাটা অনেক বেশি আনন্দের হয়ে উঠছে। আপনার মতামত বা প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই আমাদের জানান!







One Comment