বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক কে, কেন তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়েছে এবং বাংলা গদ্যের ইতিহাস কীভাবে বিকশিত হয়েছে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা।
বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক কাকে বলা হয়—এই প্রশ্নটি বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা সাহিত্য বলতে আমরা সাধারণত কবিতা, গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধকে বুঝি। তবে এসব সাহিত্যরীতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে গদ্যের মাধ্যমে। বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে যাঁর নাম সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর অবদান ছাড়া আধুনিক বাংলা গদ্যের কল্পনাও করা যায় না। বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলা গদ্যের শুরুর দিক
বাংলা ভাষার প্রাচীন সাহিত্য মূলত পদ্যনির্ভর ছিল। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের কাব্যধারা—সবখানেই কবিতার প্রভাব বেশি দেখা যায়। তখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাষা সাহিত্যে খুব একটা স্থান পায়নি। গদ্য ছিল সীমিত এবং অসংগঠিত। এই অবস্থায় বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে যাঁকে মানা হয়, তিনি গদ্যকে সহজ, প্রাঞ্জল ও পাঠযোগ্য করে তোলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো তাঁর ভাষার সরলতা ও কাঠামোগত শুদ্ধতা। তিনি বাংলা গদ্যে যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহার চালু করেন এবং বাক্য গঠনে স্পষ্টতা আনেন। তাঁর লেখা পাঠ করলে আজও বোঝা যায়, কতটা আধুনিক চিন্তা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। তাই বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক উপাধিটি তাঁর ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।
বিদ্যাসাগরের গদ্য রচনার বৈশিষ্ট্য
বিদ্যাসাগরের গদ্য ছিল যুক্তিনির্ভর, পরিষ্কার এবং শিক্ষামূলক। তিনি অপ্রয়োজনীয় অলংকার পরিহার করে সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী ভাষা ব্যবহার করতেন। “বর্ণপরিচয়” গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি শিশুদের জন্য বাংলা গদ্যকে সহজ করে তোলেন। এই বইয়ের ভাষা আজও বাংলা শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ কারণেই বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত।
বাংলা সমাজে বিদ্যাসাগরের প্রভাব
বিদ্যাসাগরের গদ্য শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর লেখার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের ভাবনা ছড়িয়ে পড়ে। বিধবা বিবাহ প্রচলন, নারী শিক্ষা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি গদ্যের মাধ্যমে জনমত তৈরি করেন। বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে তিনি ভাষাকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
অন্য লেখকদের অবদান ও বিদ্যাসাগরের অবস্থান
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকরা বাংলা গদ্যের বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। তবে তাঁদের ভাষা ছিল তুলনামূলক কঠিন ও সংস্কৃতনির্ভর। বিদ্যাসাগরই প্রথম গদ্যকে প্রমিত ও গ্রহণযোগ্য রূপ দেন। তাই অন্যদের অবদান থাকা সত্ত্বেও বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে বিদ্যাসাগরই সর্বাধিক স্বীকৃত।
প্রশ্ন-উত্তর পর্ব
বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বলা হয়।
তাঁর গদ্য সহজ, প্রাঞ্জল ও ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ, যা সাধারণ পাঠকের জন্য বোধগম্য।
“বর্ণপরিচয়” গ্রন্থটি বিদ্যাসাগরের গদ্যশৈলীর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।
সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবস্থান অনন্য। তিনি বাংলা ভাষাকে সহজ, আধুনিক এবং কার্যকর রূপ দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি মজবুত হয় এবং পরবর্তী লেখকরা সেই পথ অনুসরণ করে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।




